জ্বালানি সংকট নিয়ে নতুন পরিকল্পনা নয়, আগের ১০ দফা বাস্তবায়ন চান জামায়াত
নিউজফিল্ড রিপোর্ট:
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন করে পরিকল্পনা চাওয়ার পরিবর্তে প্রায় তিন মাস আগে বিরোধী দলের দেওয়া ১০ দফা সুপারিশ কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের প্রস্তাব নতুন নয়। গত ২১ মে জাতীয় সংসদের জ্বালানি সংকটসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে লিখিতভাবে এসব সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। এখন কোন সুপারিশে কাজ শুরু হয়েছে, কোনটি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোনগুলো এখনো কাগজে পড়ে আছে—সরকারকে তার জবাব দিতে হবে।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
‘পরিকল্পনা সরকারের টেবিলেই রয়েছে’
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলগুলোর কাছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা চেয়েছেন। বিষয়টিকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, তাদের পরিকল্পনা নতুন নয়; প্রায় তিন মাস ধরেই তা সরকারের হাতে রয়েছে।
তার ভাষ্য, ২১ মে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচ সদস্যের পক্ষ থেকে ১০ দফা সুপারিশ জমা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ৭ জুন জ্বালানিমন্ত্রী ওই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এসব প্রস্তাবের মধ্যে ছিল দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে কূপে ওয়ার্কওভার, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগ, স্থল ও সমুদ্রভাগে অনুসন্ধান জোরদার, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) দ্রুত চালু করা, জ্বালানি সরবরাহে ডিজিটাল মনিটরিং এবং রুফটপ সোলার সম্প্রসারণ।
‘অগ্রগতি জনগণের সামনে পরিষ্কার করতে হবে’
জামায়াতের এই নেতা বলেন, এখন মূল প্রশ্ন পরিকল্পনা আছে কি না—সেটি নয়। বরং তিন মাস ধরে সরকারের হাতে থাকা সেই পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটির কাজ শুরু হয়েছে এবং কোনগুলো গ্রহণ করা হয়নি, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, গত ১৪ আগস্ট জামায়াতের আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাতীয় সংসদের জরুরি অধিবেশন আহ্বানের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছেন। এর একটি অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও দেওয়া হয়েছে।
শুধু নতুন এফএসআরইউ দিয়ে সংকটের সমাধান নয়
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার নতুন এফএসআরইউ নির্মাণ করলে তাতে আপত্তি নেই। তবে শুধু নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করলেই দেশের জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।
তার ব্যাখ্যা, এফএসআরইউ নিজে গ্যাস উৎপাদন করে না। এর জন্য এলএনজি আমদানি করতে হয়, প্রয়োজন হয় বৈদেশিক মুদ্রার এবং আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পর্যাপ্ত পাইপলাইনেরও প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন—এলএনজি কোথা থেকে আসবে, কত দামে আসবে, সরবরাহ চুক্তি কী হবে, পাইপলাইন কখন তৈরি হবে এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কতটা বাড়বে—এসব বিষয়ও একই সঙ্গে স্পষ্ট করতে হবে।
৯০ দিনে ছয়টি পদক্ষেপের প্রস্তাব
সংকট মোকাবিলায় আগামী ৯০ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান ছয়টি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব বলে মনে করে জামায়াত।
দলের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে দ্রুত ফলদায়ক গ্যাসকূপে ওয়ার্কওভার শুরু, বন্ধ ও কম উৎপাদনশীল কূপের তালিকা প্রকাশ, ভোলার গ্যাস ব্যবহারে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, সিস্টেম লস ও অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, গ্যাস বণ্টনের প্রকাশ্য সময়সূচি এবং ইতোমধ্যে নির্মিত এসপিএম ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তিন মাসের মধ্যে সমুদ্রের নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের ফল পাওয়া বা বড় পাইপলাইন নির্মাণ সম্ভব নয়। তবে বাস্তবসম্মত ও দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ এই সময়ের মধ্যে নেওয়া সম্ভব।
‘জ্বালানি সংকটের জবাব রাজনৈতিক ব্যঙ্গ দিয়ে নয়’
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে দাবি করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাইয়ে একটি এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি চায়। এসব দাবিকে রাজনৈতিক ব্যঙ্গের মাধ্যমে নয়, কার্যকর সমাধানের মাধ্যমে মোকাবিলা করা উচিত।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, হারিকেনের সামনে ফ্যান চলার কোনো একটি ছবি দিয়ে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সংকটের বাস্তবতা বিচার করা সম্ভব নয়। সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে প্রয়োজন তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মূল্যায়ন।
প্রশাসনিক সংস্কারেরও প্রস্তাব
জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন দ্রুত করতে চার ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাবও দিয়েছে জামায়াত।
এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পর্যায়ে একটি ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি এনার্জি সেল’ গঠন, জরুরি ওয়ার্কওভার ও সংস্কারকাজে নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সকে অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া, জরুরি দরপত্র মূল্যায়নের স্থায়ী ব্যবস্থা এবং অগ্রাধিকার প্রকল্পে একক তদারকি কাঠামো তৈরি।
এ ছাড়া কোন ফাইল কোথায় কত দিন আটকে আছে, সেই তথ্য নিয়মিত প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
৯০ দিন পর সংসদে অগ্রগতি প্রতিবেদন চান
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার, বিরোধী দল, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, বিপিডিবি, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী ও স্বাধীন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা উচিত।
আগামী ৯০ দিনের মধ্যে কত গ্যাস উৎপাদন বেড়েছে, কত সিস্টেম লস কমেছে এবং কত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে—এসব তথ্য সংসদে অগ্রগতি প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপনের দাবি জানান তিনি।
‘সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চাই না’
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ হলে এর প্রভাব শুধু সরকারের ওপর নয়, পুরো দেশের ওপর পড়বে বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
তিনি বলেন, সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ পরিবার, শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং দেশের অর্থনীতি। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কার্যকর সমাধান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধী দলের পরিকল্পনা সরকারের কাছে আগে থেকেই রয়েছে। এখন নতুন পরিকল্পনার পরিবর্তে সেগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ৯০ দিন পর তারা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতির হিসাব চাইবেন—সরকারকে বিব্রত করার জন্য নয়, দেশের মানুষের স্বার্থে।
প্রধান সম্পাদক