শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ সারাদেশ জাতীয় আন্তর্জাতিক অর্থ ও বাণিজ্য খেলা চাকরি জীবনযাপন বিনোদন

হত্যার দায় স্বীকার অভিযুক্ত দুই খুনি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের

  • আপলোড তারিখঃ ২৪-০৮-২০২৬ ইং
হত্যার দায় স্বীকার অভিযুক্ত দুই খুনি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের

রংপুরে একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা: আদালতে স্বীকারোক্তি দুই আসামির

নিউজফিল্ড রিপোর্ট:

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। পরে মুখ্য মহানগর হাকিম মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তারা।

জবানবন্দি গ্রহণ শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে দুজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দুই আসামিই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন। ফলে তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

নিহত চারজন

নিহতরা হলেন—রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।

গত শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যার দাবি পুলিশের

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) একই এলাকার বাসিন্দা এবং তারা আত্মীয়। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাশের ভবনের ওপর দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিলেন তারা।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করলে তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

তার চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে আসার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। পরে মায়ের চিৎকার শুনে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

পুলিশের দাবি, এরপর ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।

হত্যার পর ঘর তছনছ করার অভিযোগ

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়ির একটি বাথরুমে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করেন।

পরে জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে সেগুলো কাছাকাছি একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত স্থানে লুকিয়ে রাখেন বলে পুলিশের দাবি।

অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সেখান থেকে এসব আলামত জব্দ করা হয়েছে।

তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ। এমনকি আঙুলের ছাপ মুছে ফেলতে পরিবারের দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল বলে পুলিশ দাবি করেছে।

নিহতদের মুখ ঝলসানো নিয়ে ভিন্ন তথ্য

হত্যাকাণ্ডের শিকার চারজনের মুখমণ্ডল ঝলসানো অবস্থায় পাওয়া যায়। মুখের কাছে দাহ্য বা তরল পদার্থের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী বলেন, নিহতদের মুখ প্রাথমিকভাবে ঝলসানো ছিল এবং মুখের কাছে কিছু তরল পাওয়া যায়। কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তবে ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাসের বক্তব্য ভিন্ন। তার মতে, মরদেহ পচে যাওয়ার কারণে মুখের অবস্থা এমন মনে হতে পারে; এসিডে ঝলসানোর ঘটনা নেই।

প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা নিয়েও প্রশ্ন

নিহত গণপতি চক্রবর্তী প্রায় এক মাস আগে তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেছিলেন বলে জানিয়েছেন রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ।

তিনি জানান, বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য গণপতি ওই টাকা তুলেছিলেন। তবে অর্থটি ব্যাংকে রাখা হয়েছিল নাকি বাড়িতে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

গণপতির বড় ভাই ও মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তীও জানান, নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ হয়েছিল এবং বাকি কাজ শুরু করার পরিকল্পনা ছিল। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা সম্পর্কে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিছু জানেন না বলেও জানান।

অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

এ ঘটনায় রোববার নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতয়ালী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং অজ্ঞাতনামা আসামিদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়নি।

এজাহার অনুযায়ী, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর মোবাইল ফোন থেকে তার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন।

পরদিন শুক্রবার রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কোনো এক সময়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে পূজা আবার বোনকে ফোন করলে পরিবারের চারজনের ফোনই বন্ধ পান। সন্দেহ হওয়ায় তিনি স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে যান।

বাড়িটি অন্ধকার ছিল এবং ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে ছাদে উঠে জানালার তালা ভেঙে টর্চের আলোয় ভেতরে তাকিয়ে তিনি আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র এলোমেলো দেখতে পান। একই সঙ্গে বাড়ি থেকে পচা দুর্গন্ধও বের হচ্ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামি, পুলিশ কর্মকর্তা ও ফরেনসিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা চলছে।

একই সঙ্গে এক আসামির পরনের শার্ট এবং গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তার শার্ট দেখতে একই রকম হওয়ায় বিভিন্ন প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

তবে এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা বা দাবির সত্যতা তদন্তের তথ্য দিয়ে এখনো নিশ্চিত হয়নি। হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে।



কমেন্ট বক্স
notebook

আমরা দেশকে পুনর্গঠন করতে চাইলে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না: প্রধানমন্ত্রী