ডেঙ্গুর হটস্পট খুলনা, হাসপাতালে ভর্তি ধারণক্ষমতার চার গুণ বেশি রোগী

আপলোড তারিখঃ 2026-09-01 ইং
ডেঙ্গুর হটস্পট খুলনা, হাসপাতালে ভর্তি ধারণক্ষমতার চার গুণ বেশি রোগী ছবির ক্যাপশন:

খুলনায় ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি, হাসপাতালে জায়গা নেই; রেড জোনে ১০ ওয়ার্ড

নিউজফিল্ড রিপোর্ট:

উপকূলীয় নগরী খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো। অনেক ক্ষেত্রে শয্যা না পেয়ে মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের।

এদিকে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মশক নিধন কার্যক্রম, ওষুধ ছিটানো ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অব্যাহত থাকলেও নগরীতে এডিস মশার উপদ্রব কমছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নগরীর ১০টি ওয়ার্ডকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠন।

২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ২৮৩ রোগী

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের সরকারি হাসপাতালে ২২৩ জন এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে ৬০ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন খুলনা জেলায়। সেখানে নতুন করে ১৪৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৮৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৫৯ জন।

এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ জন।

অন্যদিকে যশোরে ৩২ জন, নড়াইলে ১২, ঝিনাইদহে ৮, সাতক্ষীরায় ৭, বাগেরহাটে ৫, মাগুরায় ৫, মেহেরপুরে ৪ এবং কুষ্টিয়ায় ৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চুয়াডাঙ্গায় নতুন কোনো রোগী ভর্তি হননি।

৮ মাসে আক্রান্ত ৫ হাজার ৮৪৮

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন জানান, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ৫ হাজার ৮৪৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪ হাজার ৯৫৪ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ২০ জন। বর্তমানে বিভাগের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭৬০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ২০ মৃত্যুর মধ্যে খুলনা জেলাতেই মারা গেছেন ১৯ জন। অন্য একজনের মৃত্যু হয়েছে বাগেরহাটে।

আগস্টেই সর্বোচ্চ মৃত্যু

পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন ৮ জন। অথচ শুধু আগস্ট মাসেই মৃত্যু হয়েছে আরও ১২ জনের।

অর্থাৎ বছরের প্রথম আট মাসের মধ্যে আগস্টেই ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

খুমেক হাসপাতালে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে মোট ১ হাজার ৩৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বর্তমানে হাসপাতালটিতে ১৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

হাসপাতাল পরিদর্শনে দেখা গেছে, নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দা, করিডোর ও মেঝেতেও বেড বসিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। শিশুদের পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডেও অতিরিক্ত রোগীর চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে।

‘ডেডিকেটেড ১৫ বেডে ৫২ রোগী’

খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ম্যানেজার মো. হামিদুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ প্রতিদিনই বাড়ছে।

হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১৫টি বেড থাকলেও বর্তমানে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৫২ জন। অতিরিক্ত রোগীদের সংকটকালীন বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কেবিনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

খুলনার আদ্-দীন হাসপাতালের ম্যানেজার মো. হোসেন আলীও জানান, ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেক বেশি। বর্তমানে সিঙ্গেল বেড দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। হাসপাতালটিতে ৬০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।

বর্ষায় ডেঙ্গু বাড়ার আশঙ্কা

খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. হিমেল ঘোষ বলেন, সাধারণত জুলাইয়ের পর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। বর্ষা ও বর্ষা শেষে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হওয়ায় এ সময় মশার উপদ্রবও বাড়ে।

তার মতে, আগে এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় বেশি কামড়ালেও এখন রাত ও দিন—দুই সময়েই কামড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার দাবি স্বাস্থ্য বিভাগের

খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. শওকত আলী বলেন, পানি জমে থাকা স্থানেই মশা বংশবিস্তার করে। এখন এডিস মশা শুধু স্বচ্ছ পানিতে নয়, ময়লাযুক্ত পানিতেও বংশবিস্তার করছে।

তিনি জানান, হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ, মেডিকেল টিম গঠন এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আইসোলেশন ইউনিট বা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে অন্তত পাঁচটি করে শয্যা রাখা হয়েছে।

নরমাল স্যালাইন, ওরস্যালাইন, প্যারাসিটামল, মশারি এবং ডেঙ্গু পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কিটও পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠে রাজনৈতিক দলগুলো

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোকেও মাঠে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে।

খুলনা মহানগর বিএনপি পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে খুলনাকে ‘মহামারি এলাকা’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন, সচেতনতা কার্যক্রম, রক্তদান এবং রোগীদের খোঁজখবর নেওয়ার কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা জানান, রোগীদের চিকিৎসক পরামর্শ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, রক্তের গ্রুপ ম্যাচিং ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত এলাকায় অস্থায়ী সেবাকেন্দ্র চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। দলটির খুলনা মহানগর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক উদ্যোগ।

৩১ ওয়ার্ড তিন জোনে ভাগ

ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের ভিত্তিতে কেসিসি নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডকে রেড, ইয়েলো ও অরেঞ্জ—এই তিন জোনে ভাগ করেছে।

এর মধ্যে ১০টি ওয়ার্ডকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছেন বলে কেসিসির তথ্য।

রেড জোনের ওয়ার্ডগুলো হলো ১৭, ১৮, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ড।

এ ছাড়া ১, ১৯, ২৬ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডকে অতিসংক্রমিত এলাকা এবং ২, ১০ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডকে মৃদু আক্রান্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিনামূল্যে চিকিৎসা ও মশক নিধন কার্যক্রম

কেসিসির তত্ত্বাবধানে ১৭, ২২ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প চালু করা হয়েছে। এসব ক্যাম্পে নাপা ট্যাবলেট ও স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে।

কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শামিউল ইসলাম জানান, মশক নিধন জোরদার করতে একাধিক উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

প্রতিদিন সকালে লার্ভা ধ্বংসে ‘অ্যাবেট’ স্প্রে এবং বিকেলে ফগিংয়ের মাধ্যমে মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি নগরবাসীকে সচেতন করতে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে।

লার্ভা পেলেই জরিমানা

এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাও জোরদার করেছে সিটি করপোরেশন।

বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জমে থাকা পানি বা এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানা করা হচ্ছে।

কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলামু মঞ্জু বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কয়েক মাস আগে থেকেই কাজ শুরু করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর পরও সংক্রমণ আশানুরূপ কমেনি।

তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে মাঠে নামানো হয়েছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

টব, এসি, ছাদ, ঝোপঝাড় কিংবা অন্য কোনো স্থানে যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরীর সড়ক ও ড্রেন পরিষ্কারের পাশাপাশি প্রতিটি বাড়িতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার বাড়তে থাকায় খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ সাজেদা আক্তার সাজু
ফোনঃ+৮৮০১৯০৯৬২৯১৯৩

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সাজেদা আক্তার সাজু

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ সাজেদা আক্তার সাজু

বার্তা সম্পাদকঃ সাজেদা আক্তার সাজু


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ

অফিস ঠিকানাঃ সালাম ছালেহা প‍্যালেস
রোড নং-১
বাড়ি নং-২
গ্রাম/মহল্লাঃ পশ্চিম এমারগাঁও,
মধুসিটি হাউজিং সোসাইটি -১
কেরানীগঞ্জ , ঢাকা - ১৩২২

ইমেইলঃ newsfieldbd@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৯০৯-৬২৯১৯৩, ০১৯০৯৬২৯১৯৩(বার্তা-বিভাগ), ০১৯০৯৬২৯১৯৩(সার্কুলেশন)