ছবির ক্যাপশন:
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে এডিবি
নিউজফিল্ড অর্থনীতি ডেস্ক:
চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জরুরি সেবার মান উন্নয়নে ১৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৯ পয়সা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) এডিবির ঢাকা অফিস এ তথ্য জানিয়েছে।
এডিবির অর্থায়নে ‘টেকসই জ্বালানি উন্নয়ন ও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের ২৬টি দুর্গম উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৩৫ হাজার পরিবারসহ অন্তত ৮৮ হাজার অতিরিক্ত পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে বলে জানিয়েছে এডিবি।
বসবে ৬টি নতুন সাবস্টেশন
প্রকল্পের আওতায় ৮০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার সক্ষমতার ছয়টি নতুন ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন স্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া কম-ক্ষয়সম্পন্ন পরিবাহী ব্যবহার করে ৫ হাজার ৩২ কিলোমিটার নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ১ হাজার ৮৭৪ কিলোমিটার পুরোনো বিতরণ লাইন, চারটি সাবস্টেশন, একটি সুইচিং স্টেশন এবং একটি আঞ্চলিক মেরামত কারখানা সংস্কার করা হবে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সিস্টেম লস ও পরিচালন ব্যয় কমার পাশাপাশি গ্রিডের সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে বছরে অন্তত ১৯ হাজার ৩০০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন এড়ানো সম্ভব হবে এবং দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আরও সহনশীল হবে।
পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ এখনও অনেক কম
এডিবির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় ১৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। তাদের অর্ধেকেরও বেশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
দেশব্যাপী জাতীয় বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ থাকলেও পার্বত্য তিন জেলায় গ্রিড সংযোগের হার তুলনামূলকভাবে কম। খাগড়াছড়িতে এ হার ৪৯ শতাংশ, রাঙ্গামাটিতে ৪৩ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৪১ শতাংশ।
প্রকল্পের মাধ্যমে ২০৩২ সালের মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলে গ্রিড সুবিধার হার ৬৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌর ও পিকো-হাইড্রোপাওয়ারসহ ভবিষ্যতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
পানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাতেও বিনিয়োগ
শুধু বিদ্যুৎ অবকাঠামো নয়, সামাজিক উন্নয়নেও অর্থ ব্যবহার করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় অন্তত ৩০টি সৌরশক্তিচালিত সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এসব ব্যবস্থাপনার নেতৃত্বে স্থানীয় কমিউনিটি সংস্থাগুলো থাকবে এবং নেতৃত্ব পর্যায়ে অন্তত ৩০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় স্কুল, হাসপাতাল, মন্দির ও ক্লিনিকসহ অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সোলার ব্যাকআপ সিস্টেম স্থাপন করা হবে।
১ হাজার মানুষের জীবিকায়ন প্রশিক্ষণ
স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতেও প্রকল্পে বিভিন্ন কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
এর আওতায় অন্তত ১ হাজার মানুষকে জীবিকায়ন প্রশিক্ষণ, ২০০ জনের বেশি উদ্যোক্তাকে বিজনেস ইনকিউবেশন সহায়তা এবং ৩০০ শিক্ষার্থীকে জ্বালানি খাতের ক্যারিয়ার ও দুর্যোগ-সহনশীল শক্তি ব্যবস্থা বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হবে।
সেবার মান বাড়াতে তিনটি গ্রাহক অভিযোগ কেন্দ্র এবং ডিজিটাল মনিটরিং সুবিধাসহ তিনটি ডে-কেয়ার কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রাহকসেবা, বিদ্যুৎ বিতরণ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ-সহনশীল প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
‘নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উন্নয়নের চালিকাশক্তি’
বাংলাদেশে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফং ঝাং বলেন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি।
তার মতে, প্রকল্পটি পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবিকার সুযোগ বাড়াবে এবং নারীদের অংশগ্রহণও ত্বরান্বিত করবে।
থাকছে জাপানের অনুদানও
এডিবির ঋণের পাশাপাশি জাপান সরকারের পরিচালিত ‘জাপান ফান্ড ফর প্রসপারাস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ থেকে ২.৭২ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
এ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার ৩৬.৫৪ মিলিয়ন ডলার এবং বিপিডিবি ৪৫.৬৫ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে।
সব মিলিয়ে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি, জনসেবা, কর্মসংস্থান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে এডিবি।
