মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ সারাদেশ জাতীয় আন্তর্জাতিক অর্থ ও বাণিজ্য খেলা চাকরি জীবনযাপন বিনোদন

শতভাগ পাসের মাদরাসা কমেছে ৩২২টি, শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৪৪টি

  • আপলোড তারিখঃ ১০-০৮-২০২৬ ইং
শতভাগ পাসের মাদরাসা কমেছে ৩২২টি, শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৪৪টি

দাখিলে ফল বিপর্যয়: শতভাগ পাসের মাদরাসা কমেছে ৭৯%, শূন্য পাস বেড়েছে ১৭৬%

নিউজফিল্ড রিপোর্ট:

চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে মাদরাসা শিক্ষায় বড় ধরনের অবনতি দেখা গেছে। এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা মাদরাসার সংখ্যা কমেছে প্রায় ৭৯ শতাংশ। একই সময়ে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি—এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৭৬ শতাংশ।

শুধু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফল নয়, সার্বিক ফলাফলেও হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছর দাখিল পরীক্ষায় ১ লাখ ৩২ হাজার ১৮৫ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। বিভিন্ন অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে বহিষ্কার করা হয়েছে ১৪১ জনকে।

শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠান কমেছে ৩২২টি

বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে শতভাগ পাস করা মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৪১০টি। চলতি বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৮৮টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান কমেছে ৩২২টি। শতাংশের হিসাবে এ পতন প্রায় ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

অন্যদিকে, গত বছর কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি—এমন মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৮২টি। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৬টিতে। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৪৪টি, যা প্রায় ১৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ফলে এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাসের মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ২ দশমিক ৮ গুণ হয়েছে।

এ ছাড়া ১০ শতাংশের নিচে পাসের হার থাকা মাদরাসার সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৫ সালে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৬টিতে।

সার্বিক পাসের হার ৫৫.৪৯ শতাংশ

এবার সব শাখা মিলিয়ে দাখিল পরীক্ষায় নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৭ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ লাখ ৯৬ হাজার ১৮২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। সার্বিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

সাধারণ শাখায় ২ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪০ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। পরীক্ষায় উপস্থিত হয় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫৬ জন। এ শাখায় পাস করেছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫০৬ জন। পাসের হার ৫৪ দশমিক ২২ শতাংশ।

সাধারণ শাখায় ছাত্রীদের পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ছাত্রদের ৫০ দশমিক ১১ শতাংশ।

অন্যদিকে, বিজ্ঞান শাখায় পাসের হার ৬৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এ শাখায় ২৬ হাজার ৩০ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ছাত্রদের ৬১ দশমিক ১৭ শতাংশ।

মুজাব্বিদ শাখায় ৫৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৫৭ জন। হিফযুল কোরআন শাখাতেও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন

চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ৩ হাজার ৫৭২ জন এবং ছাত্রী ৩ হাজার ১৪৪ জন। মোট উপস্থিত পরীক্ষার্থীর হিসাবে জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জিপিএ-৪ পেয়েছে ৩৩ হাজার ৩৩৬ জন। জিপিএ ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৯৯ পেয়েছে ৩৪ হাজার ৪২২ জন। ৩ থেকে ৩ দশমিক ৪৯-এর মধ্যে ফল করেছে ৪১ হাজার ৬২৫ জন।

এ ছাড়া সর্বনিম্ন ধাপে জিপিএ-১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ হাজার ৫৩৬ জন শিক্ষার্থী।

জেলাভিত্তিক ফলাফলেও বড় পার্থক্য

দাখিলের ফলাফলে জেলাভিত্তিক পাসের হারেও বড় ধরনের ব্যবধান দেখা গেছে। পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা জেলা। এ জেলায় পাসের হার ৮৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। ৮ হাজার ৭১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ হাজার ৭১৮ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৪৬০ জন।

পাসের হারে ঢাকার পর রয়েছে কক্সবাজার, ফেনী ও চট্টগ্রাম। কক্সবাজারে পাসের হার ৭৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ফেনীতে ৭৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৭১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

চট্টগ্রামে পাস করেছে ১২ হাজার ৪৯৯ জন শিক্ষার্থী। এ জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯২৭ জন।

এ ছাড়া খুলনায় পাসের হার ৬২ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সিলেটে ৫৯ দশমিক ২২ শতাংশ এবং কুমিল্লায় ৫৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

অন্যদিকে, সবচেয়ে কম পাসের হার দেখা গেছে সিরাজগঞ্জে। সেখানে পাসের হার ৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। জেলায় পাস করেছে ১ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থী।

ফলের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে বরগুনায় পাসের হার ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ, ঝালকাঠিতে ৩৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ, রাজশাহীতে ৩৯ দশমিক ১০ শতাংশ, রংপুরে ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, কুড়িগ্রামে ৪৬ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৪৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

পাহাড়ি তিন জেলার মধ্যে বান্দরবানে পাসের হার ৫১ দশমিক ৬৮ শতাংশ, খাগড়াছড়িতে ৫২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং রাঙামাটিতে ৬০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

ফল খারাপের কারণ খতিয়ে দেখবে বোর্ড

দাখিলে ফলাফলের এমন অবনতির কারণ জানতে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র এক থেকে দেড় মাস হয়েছে। ফলে আগের বছরের পরীক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে এবারের ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করার সুযোগ এখনও পুরোপুরি হয়নি।

তিনি জানান, এবার পরীক্ষাব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে অনেক মাদরাসা নিজ নিজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিলেও এবার দাখিল ও আলিম পরীক্ষার্থীদের অন্য কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। এতে কোনো প্রতিষ্ঠানে আগে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার সুযোগ কমেছে বলে মনে করেন তিনি।

এবার পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরাও ছিল। সার্বিক পরীক্ষাব্যবস্থাপনা আগের তুলনায় নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এর প্রভাব ফলাফলে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বোর্ড চেয়ারম্যান।

তবে ফলাফল কেন এতটা খারাপ হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নজরদারি বাড়বে

ফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বোর্ড চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, বোর্ডের অধীনে এবার প্রায় ২০০টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। এসব প্রতিষ্ঠানকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করা হবে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কার্যক্রম এবং অ্যাকাডেমিক মানসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে জানিয়ে অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস না করা অবশ্যই প্রশ্নের বিষয়। ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও কার্যক্রম যাচাই করা প্রয়োজন।

তিনি আরও জানান, সারা দেশে মাদরাসা শিক্ষা কার্যক্রমের মনিটরিং বাড়ানো হবে। কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে, ফল খারাপ হওয়ার কারণ কী এবং শিক্ষার মান কীভাবে উন্নত করা যায়—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

মাদরাসাগুলোর অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন বোর্ড চেয়ারম্যান।



কমেন্ট বক্স
notebook

গণতন্ত্রকে রক্ষা করাটাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ : রাষ্ট্রপতি