চট্টগ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গু, কোটি টাকা খরচেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না মশার উপদ্রব
নিউজফিল্ড রিপোর্ট:
মশক নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও চট্টগ্রাম নগরীতে মশার উপদ্রব কমছে না। বরং বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বও উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে।
আজ ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং এসব রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরতেই দিবসটি পালিত হয়।
আগস্টেই আক্রান্ত ৬৬৩ জন
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন তিনজন।
শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৫৩৬ জন। আগস্টের প্রথম ১৯ দিনে নতুন করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৬৬৩ জনের। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সাধারণত চট্টগ্রামে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও বিষয়টি স্পষ্ট।
২০২২ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২ হাজার ৬৪০ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৩ জনে। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৭৩৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬০ জন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এরপর জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে ৫৩৬ জনে পৌঁছে যায়। ওই মাসে মারা যান দুজন।
‘বর্ষায় এডিসের প্রজননের পরিবেশ তৈরি হয়’
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জুলাই ও আগস্টের প্রথম দিকের আক্রান্তের সংখ্যা আগের ছয় মাসের মোট আক্রান্তের প্রায় দ্বিগুণ।
তার মতে, বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। বিভিন্ন উপজেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও ৯৯ শতাংশের বেশি রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। মারা যাওয়া তিনজনই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেরি করেছিলেন বলে জানান তিনি।
জরিপে উচ্চঝুঁকির চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রাক-বর্ষা জরিপে চট্টগ্রাম নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব আশঙ্কাজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে।
৮ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পরিচালিত ওই জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।
জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স পাওয়া গেছে ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, আর নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। ব্রেটো ইনডেক্স দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।
জরিপে উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা ও দক্ষিণ হালিশহরকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ জানান, জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে সংরক্ষণ করে রাখা পানির পাত্র ও নির্মাণাধীন ভবনকে এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশক নিধনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ব্যয়ও কম নয়।
২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে শুধু মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে চসিক। এর বাইরে ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
২০০০ সাল থেকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে চসিকের মোট ব্যয় প্রায় ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত এক দশকেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
তবে এত ব্যয়ের পরও চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, জামালখান, চকবাজার ও হালিশহরসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মশার উপদ্রব কমেনি বলে অভিযোগ করছেন।
৭০ লাখ মানুষের জন্য কর্মী ৩৫৫ জন
চসিকের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ৩৫৫ জন কর্মী। সংস্থাটির দাবি, প্রতিটি ব্লকে ৭২ ঘণ্টা পরপর ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয় না। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে মশক নিধন কর্মীদের দেখা যায় না।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রায় ৭০ লাখ মানুষের নগরীতে সাড়ে তিনশোর কিছু বেশি কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন। তারপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের চেয়ে লার্ভা ধ্বংস করা বেশি কার্যকর। তাই শুধু ফগার মেশিনে ধোঁয়া দেওয়ার পরিবর্তে লার্ভা ধ্বংসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শুধু ওষুধ ছিটিয়ে সমাধান নয়: বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মশা রয়েছে, তাদের প্রজননস্থল কোথায় এবং কোন কীটনাশক কার্যকর—এসব তথ্য নিয়মিত পরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. আহসান হাবিব সিয়াম বলেন, চসিকের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বড় একটি ঘাটতি হলো কীটতত্ত্ববিদদের পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততা না থাকা। বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ছাড়া বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
নগর পরিকল্পনাবিদ মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মশার মধ্যে সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তাই কোন ওষুধে লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশা সবচেয়ে কার্যকরভাবে ধ্বংস হচ্ছে, তা নিয়মিত পরীক্ষাগারে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ দল
চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৬০ সদস্যের একটি বিশেষ দল কাজ করছে।
তিনি জানান, আগামী ছয় মাসের জন্য পর্যাপ্ত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড মজুত রাখা হয়েছে।
বিশ্ব মশা দিবসে বিশেষজ্ঞদের বার্তা, মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনসহ আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণে নগরবাসীকেও সক্রিয় হতে হবে। কারণ এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর উপায়।
প্রধান সম্পাদক